18/07/2025

[৬] সমসাময়িক আলেমগণের বক্তব্য থেকে সমতল পৃথিবীর দলীলসমূহ

 

[১] ইমাম ইসমাঈল হাক্কী আল ইস্তানবুলী (রাহিমাহুল্লাহ) [১১২৭ হিজরী]

ইমাম ইসমাঈল হাক্কী ইস্তানবুলী (রাহিমাহুল্লাহ)

তার তাফসীরে "রুহুল বায়ান"-এর ৯ম খন্ড ১০৭ নং পৃষ্ঠায়,

আল্লাহ তায়ালার এই বাণীঃ

{وَالْأَرْضَ مَدَدْناها}

এর ব্যাখ্যায় বলেনঃ

اى بسطناها وفرشناها على وجه الماء مسيرة ‌خمسمائة ‌عام من ‌تحت ‌الكعبة وهذا دليل على ان الأرض مبسوطة وليست على شكل الكرة كما في كشف الاسرار

অর্থাৎ আমরা একে প্রশস্ত করেছি ও পানির ওপর বিছিয়ে দিয়েছি, [যার বিস্তৃতি] কাবা'র নিচ থেকে পাঁচশ বছরের পথের সমান। এটি প্রমাণ করে যে পৃথিবী সমতল (প্রসারিত), গোলাকার নয়— যেমনটি "কাশফুল আসরার" গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে।

«روح البيان» (9/ 107)

 

"রুহুল বায়ান"-এর ৯ম খন্ড ১৭১ নং পৃষ্ঠায়,

আল্লাহ তায়ালার এই বাণীঃ

{فَرَشْناها}

এর ব্যাখ্যায় বলেনঃ

مهدناها وبسطناها من ‌تحت ‌الكعبة مسيرة ‌خمسمائة ‌عام ليستقروا عليها ويتقلبوا كما يتقلب أحدهم على فراشه ومهاده

"প্রশস্ত করেছি এবং কাবা'র নীচ থেকে ৫০০ বছরের পথব্যাপী বিস্তৃত করেছি, যাতে তারা তাতে স্থির থাকতে পারে এবং নিজেদের শয্যায় পাশ ফেরার মতো স্বাধীনভাবে বিচরণ করতে পারে।"

«روح البيان» (9/171)


[২] ইমাম আল-কুনাবী (রাহিমাহুল্লাহ) [১১৯৫ হিজরী]

তিনি তাফসির আল-বাইদাওয়ী-এর হাশিয়াতে (১০ম খণ্ড, ৪৫১ পৃষ্ঠা) বলেন:

قوله : (أي بسطها طولاً وعرضاً) إذ الأرض عبارة عنهما والكلام من قبيل من قتل قتيلاً فله سلبه إذ كونها أرضاً بعد المد والبسط أو من قبيل ضيق فم البئر استدل به بعضهم على تسطح الأرض وقال الإمام ثبت بالدليل أن الأرض كرة ولا ينافي ذلك قوله تعالى : وهو الذي مد الأرض [الرعد: [٣] وذلك أن جميع الأرض جسم عظيم والكرة إذا كانت في غاية الكبر كان كل قطعة منها يشاهد سطحاً انتهى. ولا يخفى أنه أراد بالدليل الدليل العقلي على أصول الفلاسفة التي غير تامة على قواعد أهل الملة والشريعة فلا يعدل عن ظاهر الآية بما قرر عند الفلاسفة والمتفلسفة .

তিনি বলেন, “তাঁর বক্তব্য (অর্থাৎ পৃথিবীকে দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে বিস্তৃত করা) - কারণ 'পৃথিবী' শব্দটি মূলত এ দু'টি দিক (দৈর্ঘ্য-প্রস্থ) দ্বারাই সংজ্ঞায়িত। এই বক্তব্য ঐ রীতিতে বলা হয়েছে, যেমন বলা হয়: 'যে ব্যক্তি কোনো হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নেবে, সে মৃতের ধনসম্পত্তি পাবে'অর্থাৎ, পৃথিবীকে 'মাদ্দ' (প্রসারিত করা) ও 'বাসত' (সমতল করা)-এর পরই তা 'পৃথিবী' নামের উপযুক্ত হয়েছে। অথবা এটি সেই রীতিতে বলা হয়েছে, যেমন বলা হয়: 'কূপের মুখ সংকীর্ণ করা'

কেউ কেউ এ আয়াতকে পৃথিবীর সমতলতার প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে ইমাম আল-বাইদাওয়ী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: 'প্রমাণ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত যে পৃথিবী গোলাকার। আর এটা আল্লাহর বাণী "তিনিই পৃথিবীকে প্রসারিত করেছেন" (সূরা রা'দ: ৩)-এর সাথে সাংঘর্ষিক নয়। কারণ সমগ্র পৃথিবী একটি বিশাল দেহ, আর যখন কোনো গোলক অত্যন্ত বৃহৎ হয়, তখন তার প্রতিটি অংশ দর্শকের নিকট সমতল মনে হয়।'

এরপর আল-কুনাবী (রাহিমাহুল্লাহ) মন্তব্য করেন: এটি স্পষ্ট যে, তিনি (আল-বাদাওয়ি) এখানে 'প্রমাণ' বলতে দার্শনিকদের বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তিকে বোঝাচ্ছেন, যা প্রকৃতপক্ষে শরীয়ত ও ধর্মীয় বিধানের ভিত্তির সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই কোনো আয়াতের স্পষ্ট অর্থকে দার্শনিকদের মতের ভিত্তিতে পরিবর্তন করা উচিত নয়।

[المصدر: حاشية القونوي على تفسير البيضاوي ومعه حاشية ابن التمجيد - ج ١٠ - ص ٤٥١]


[৩] মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব ইবনে আব্দুর রাযযাক আল-মারাকিশী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত্যু ১২০৩ হিজরী]

মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব ইবনে আব্দুর রাযযাক আল-মারাকিশী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর আল আযবুয যুলাল কিতাবের ৬০ নম্বর পৃষ্ঠায় বলেন:

على أن فكرة كون الأرض مسطحة وليست بكرة هي فكرة شائعة بين بعض طبقة أهل العلم،

পৃথিবী সমতল এবং গোলাকার নয়, এমন ধারণা কিছু আলেমের মধ্যে একটি প্রচলিত মত।

 

[المصدر : العزبوز جلال - ص 60]
الحاج محمد بن عبد الوهاب بن عبد الرازق المراكشي

 

তথ্যসূত্রঃ https://archive.org/details/3adbZolal01/3adb-zolal-01/page/60/mode/1up


[৪] ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে আলী আশ-শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত্যু ১২৫০ হিজরী]

ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে আলী আশ-শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,

 

«وَالْأَرْضَ مَدَدْناها أَيْ: بَسَطْنَاهَا وَفَرَشْنَاهَا كَمَا فِي قَوْلِهِ: وَالْأَرْضَ بَعْدَ ذلِكَ دَحاها «النازعات: ٣٠» ، وفي قوله: وَالْأَرْضَ فَرَشْناها فَنِعْمَ الْماهِدُونَ «الذاريات: ٤٨» ، وَفِيهِ رَدٌّ عَلَى مَنْ زَعَمَ أَنَّهَا كَالْكُرَةِ.»

 

আর "وَالْأَرْضَ مَدَدْنَاهَا" (এবং পৃথিবীকে আমরা বিস্তৃত করেছি) অর্থাৎ আমরা এটাকে বিস্তৃত করেছি এবং বিছিয়ে দিয়েছি, যেমন আল্লাহর বাণীতে বলা হয়েছেঃ

 

"وَالْأَرْضَ بَعْدَ ذَٰلِكَ دَحَاهَا"

 

 'এবং পৃথিবীকে এরপর বিছিয়ে দিয়েছেন' [৭৯:৩০]

এবং তাঁর বাণীঃ

 

"وَ الۡاَرۡضَ فَرَشۡنٰهَا فَنِعۡمَ الۡمٰهِدُوۡنَ"

 

'আর আমি যমীনকে বিছিয়ে দিয়েছি। আমি কতইনা সুন্দর বিছানা প্রস্তুতকারী!' [৫১:৪৮]

 

এতে তাদের দাবির খণ্ডন রয়েছে, যারা বলে যে পৃথিবী গোলকের মতো।

 

📘| - [كتاب فتح القدير للشوكاني,3/151]

 

 

 

তথ্যসূত্রঃ https://shamela.ws/book/23623/1381#p1


[৫] ইমাম আল-মাযহারী (রাহিমাহুল্লাহ) [১২২৫ হিজরী]

তিনি তাঁর তাফসিরুল মাযহারী কিতাবের ১০ম খণ্ড, ২৫২ নম্বর পৃষ্ঠায়, আল্লাহ তায়ালার এই বাণী

{وَإِلَى الْأَرْضِ كَيْفَ سُطِحَتْ} [الغاشية: 20]

– "এবং পৃথিবীর প্রতি তাকিয়ে দেখ, কিভাবে তা সমতল করা হয়েছে" – এর ব্যাখ্যায় বলেন:

سطحا مستويا بساطا واحدا فكذا الزرابي

অর্থ: “এটি সমানভাবে সমতল করা হয়েছে, একটানা বিছানার মতো, যেমন কার্পেট সমানভাবে বিছানো হয়।”

[المصدر: التفسير المظهري - ج 10 - ص 252]


[৬] ইমাম আল আলূসী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত্যু ১২৭০ হিজরী]

তিনি তাঁর তাফসীর গ্রন্থ রূহুল মা‘আনী-তে আল্লাহ তায়ালার এই বাণীর ব্যাখ্যায় বলেন:

{وَالْأَرْضَ مَدَدْنَاهَا}

“এবং আমি পৃথিবীকে বিস্তৃত করেছি।”

وعن ابن عباس أنه قال: بسطناها على وجه الماء.

ইবন আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমরা একে পানির ওপর সমতলভাবে বিস্তৃত করেছি।”

 

[المصدر : تفسير الألوسي - روح المعاني - ج ٧ - ص ٨٦]

তথ্যসূত্রঃ https://shamela.ws/book/35563/2780


[৭] শায়খ নওয়াব সিদ্দিক হাসান খান ভূপালি (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত্যু ১৩০৭ হিজরী]

শায়খ নওয়াব সিদ্দিক হাসান খান ভূপালি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,

 

«(مددناها) أي بسطناها وفرشناها على وجه الماء كما في قوله والأرض بعد ذلك دحاها وفي قوله والأرض فرشناها فنعم الماهدون وفيه رد على من زعم أنها كالكرة»

 

[আমরা তা বিস্তৃত করেছি] অর্থাৎ, আমরা তা বিস্তৃত করেছি এবং পানির ওপর বিছিয়ে দিয়েছি।

 

যেমন আল্লাহর বাণীতে বলা হয়েছেঃ

 

"وَالْأَرْضَ بَعْدَ ذَٰلِكَ دَحَاهَا"

 

'এবং পৃথিবীকে এরপর বিছিয়ে দিয়েছেন' [৭৯:৩০]

এবং তাঁর বাণীঃ

 

"وَ الۡاَرۡضَ فَرَشۡنٰهَا فَنِعۡمَ الۡمٰهِدُوۡنَ"

 

'আর আমি যমীনকে বিছিয়ে দিয়েছি। আমি কতইনা সুন্দর বিছানা প্রস্তুতকারী!' [৫১:৪৮]

 

এতে তাদের দাবির খণ্ডন রয়েছে, যারা বলে যে পৃথিবী গোলকের মতো।"

 

* فتحُ البيان في مقاصد القرآن [7/157]

 

 

 

তথ্যসূত্রঃ https://shamela.ws/book/37458/4266

 


 

তিনি তাঁর "ফাতহুল বায়ান ‎ফি মাকাসিদিল কুরআন" কিতাবের ৭ম খণ্ড, ১১-১২ নম্বর পৃষ্ঠায় বলেন:

 

‎আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,

وهو الذي مد الأرض

'তিনি পৃথিবীকে বিস্তৃত করেছেন,

এর ব্যাখ্যায় বলেন,

(وهو الذي مد الأرض) على وجه الماء، قال الفراء: بسطها طولاً وعرضاً لتثبت عليها الأقدام ويتقلب عليها الحيوان، وقال الأصم: أن المدّ هو البسط إلى ما لا يدرك منتهاه زاد الكرخي: فقوله مد الأرض يشعر بأنه تعالى جعل الأرض حجماً عظيماً لا يقع البصر على منتهاه انتهى. قيل وهذا المد الظاهر للبصر لا ينافي كرويتها في نفسها لتباعد أطرافها، وبه قال أهل الهيئة ، والله أخبر أنه مد الأرض وأنه دحاها وبسطهما وأنه جعلها فراشاً وكل ذلك يدل على كونها مسطحة كالأكف، وهو أصدق قيلاً وأبين دليلاً من أصحاب الهيئة.

 

(আর তিনিই যিনি পৃথিবীকে বিস্তৃত করেছেন) পানির ওপর। ফাররা (রহ.) বলেছেন: তিনি পৃথিবীকে দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে বিস্তৃত করেছেন, যাতে পা স্থিরভাবে দাঁড়াতে পারে এবং প্রাণীরা এর ওপর চলাফেরা করতে পারে। আসাম (রহ.) বলেছেন: "মাদ্দ" (বিস্তৃত করা) অর্থ হলো এমনভাবে প্রসারিত করা যার শেষ সীমা অনুধাবন করা যায় না। কারখী (রহ.) যোগ করেছেন: "আল্লাহর বাণী 'মাদ্দাল আরদ' (পৃথিবীকে বিস্তৃত করা) ইঙ্গিত দেয় যে তিনি পৃথিবীকে এমন বিশাল আকার দান করেছেন, যার শেষপ্রান্ত দৃষ্টিগোচর হয় না।"

 

কেউ কেউ বলেন, দৃষ্টির জন্য প্রকাশিত এই বিস্তৃতি পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গোলাকার আকৃতির সাথে সাংঘর্ষিক নয়, কারণ এর প্রান্তসমূহ অত্যন্ত দূরে অবস্থিত। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এই মত পোষণ করেন ।

 

তবে আল্লাহ সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে তিনি পৃথিবীকে বিস্তৃত করেছেন, প্রসারিত করেছেন, বিছিয়ে দিয়েছেন এবং একে কার্পেটের মতো সমতল করেছেন। এসব বর্ণনা প্রমাণ করে যে পৃথিবী হাতের তালুর মতো সমতল। এটি জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের যুক্তির চেয়ে অধিক সত্য ও স্পষ্ট দলিলভিত্তিক বক্তব্য।

 

فتح البيان في مقاصد القرآن (7/ 11)



[৮] ইমাম মুহাম্মাদ বিন ইউসুফ আত-তুফাইশ (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত্যু ১৩৩২ হিজরী]

তিনি তাঁর কিতাব হিমইয়ানুয জাদ ইলা দারিল মাআদ-এর ৮ম খণ্ড, ২৯০ নম্বর পৃষ্ঠায়, আল্লাহ তায়ালার এই বাণীর ব্যাখ্যায় বলেন:

{وَهُوَ الَّذِي مَدَّ الْأَرْضَ}

“এবং তিনিই পৃথিবীকে বিস্তৃত করেছেন।”

 

(وهو الذي مد) بسط (الأرض) على الماء من تحت البيت الحرام طولا وعرضا لينتفع عليها، سواء قلنا: إنها سطحية وهو الصحيح الظاهر

অর্থাৎ, পৃথিবীকে বাইতুল হারামের নিচ থেকে পানির উপর দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে বিস্তৃত করা হয়েছে— যাতে মানুষের জন্য এটি উপকারী হয়। পৃথিবী সমতল — এটাই প্রকৃত ও বাহ্যিক অর্থ।

[المصدر: هِمْيَانُ الزَّادِ إِلَى دَارِ الْمَعَاد - ج ٨ - ص ٢٩٠]


[৯] শায়খ মুহাম্মাদ আব্দুর-রহমান মুবারকপুরী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত্যু ১৩৫৩ হিজরী]

শায়খ মুহাম্মাদ আব্দুর-রহমান মুবারকপুরী [রাহিমাহুল্লাহ] বলেন,

 

قُلْتُ إِنْ أَرَادَ بِقَوْلِهِ إِنَّ الْأَرْضَ كُرَوِيَّةٌ اتِّفَاقًا أَنَّ جَمِيعَ أَئِمَّةِ الدِّينِ مِنَ السَّلَفِ وَالْخَلَفِ مُتَّفِقُونَ عَلَى كُرَوِيَّةِ الْأَرْضِ وَقَائِلُونَ بِهَا فَهَذَا بَاطِلٌ بِلَا مِرْيَةٍ وَإِنْ أَرَادَ بِهِ اتِّفَاقَ أَهْلِ الْفَلْسَفَةِ وَأَهْلِ الْهَيْئَةِ فَهَذَا مِمَّا لَا يُلْتَفَتُ إِلَيْهِ ثُمَّ مَا فَرَّعَ عَلَى كُرَوِيَّةِ الْأَرْضِ فَفِيهِ أَنْظَارٌ وَخَدَشَاتٌ فَتَفَكَّرْ قَوْلُهُ

 

আমি বলি, যদি তার (আরফুশ শাযীর লেখকের) এই বক্তব্যে উদ্দেশ্য হয় যে, পৃথিবী গোলাকার—এ বিষয়ে সকল পূর্ববর্তী ও পরবর্তী ধর্মীয় ইমামগণ একমত এবং তারা সকলেই এ মত পোষণ করেন, তবে এটা নিঃসন্দেহে বাতিল। আর যদি তার উদ্দেশ্য হয় দার্শনিক ও জ্যোতির্বিদদের ঐক্যমত, তবে এটি এমন বিষয় যাতে কোনো গুরুত্ব দেওয়া যায় না। অতঃপর পৃথিবীর গোলাকার হওয়ার উপর ভিত্তি করে তিনি যা প্রমাণ করতে চেয়েছেন, তাতে বিভিন্ন মত ও সমালোচনা রয়েছে। সুতরাং চিন্তা করুন।

 

 

📚 [تحفة الأحوذي (1/ 424)]

 

📚 [তুহফাতুল আহওয়াযী  (১/৪২৪)]


[১০] শায়খ মুক্ববিল বিন হাদী আল ওয়াদিঈ (রাহিমাহুল্লাহ) [ মৃত্যু ১৪২২ হিজরী]

ইয়েমেনের মুহাদ্দিস শাইখ মুক্ববিল বিন হাদী-আল ওয়াদিঈ রহিমাহুল্লাহকে পৃথিবী কি গোলাকার নাকি সমতল? এবং এই আয়াত সম্পর্কে “এবং পৃথিবীর দিকে, কিভাবে এটিকে সমতল করা হয়েছে?” [৮৮ঃ২০] প্রশ্ন করলে তিনি উত্তর দেন, “আলেমগণ দ্বিমত পোষণ করেন। জমহুর [সংখ্যাগরিষ্ঠ] আলেমগণ বলেছেন এটা সমতল [ফ্ল্যাট], এবং আবু মুহাম্মাদ ইবনু হাযম, এবং শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ, এবং হাফেয ইবনু কাসীর এবং তাদের একটি গ্রুপ বলেছেনঃ এটি গোলাকার, এবং কুরআন ও সুন্নাহ থেকে এমন কোন স্পষ্ট দলিল নেই যে এটি গোলাকার বা গোলাকার নয়।”

 

هل الأرض كروية أم مسطحة ؟ وما معنى قوله تعالى : " وَإِلَى الْأَرْضِ كَيْفَ سُطِحَتْ " [ الغاشية : 20 ] ؟

اختلف العلماء فجمهور أهل العلم يقولون : إنها مسطحة ، وأبو محمد بن حزم وشيخ الإسلام ابن تيمية والحافظ ابن كثير وجمعٌ معهم يقولون : إنها كروية ، وليس هناك دليل من القرآن والسنة صريح بأنها كروية ولا أنها ليست بكروية ، أما مسطحة فممكن أن في حقنا مسطحة ولا يمنع أن أطرافها يلتف ويرتفع إلى فوق ، فما هناك دليل صريح يدل على ذلك فيٌرجع إلى الواقع ، فالذي يظهر أن أبا محمد ابن حزم وشيخ الإسلام ابن تيمية ومنجرى مجراهما أنهم واسعوا الأفق وأنهم عرفوا أن أطراف الدنيا مكورة والله المستعان .
هذا وليس في الآية ما يمنع ذلك أعني قوله تعالى : " وَإِلَى الْأَرْضِ كَيْفَ سُطِحَتْ " [ الغاشية : 20 ] .

 

সরাসরি শায়খের কন্ঠে শুনুনঃ Youtube Video Link

[১১] শাইখ আবু বকর আল-জাজাইরী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত্যু ১৪৩৯ হিজরী]

তিনি তাঁর তাফসীরগ্রন্থ আইসারুত তাফাসির লি কালামিল আলিইয়্যিল কাবীর–এ সূরা আন-নাযিয়াত এর (২৮-৩০) আয়াতসমূহের ব্যাখ্যায় বলেন:

 

“فَسَوَّاهَا” — অর্থাৎ, তিনি (আল্লাহ) আকাশকে এক সমতল করে দিয়েছেন, যাতে কোনো উঁচু-নিচু নেই।

“وَأَغْطَشَ لَيْلَهَا” — অর্থাৎ, তিনি রাতকে অন্ধকারময় করেছেন, একে ঘন অন্ধকারে পরিণত করেছেন।

“وَأَخْرَجَ ضُحَاهَا” — অর্থাৎ, তিনি দিনের আলো (সকাল) বের করেছেন।

“وَالْأَرْضَ بَعْدَ ذَٰلِكَ دَحَاهَا” — অর্থাৎ, আকাশ সৃষ্টির পর তিনি পৃথিবীকে বিছিয়ে দিয়েছেন; অর্থাৎ একে প্রশস্ত করেছেন এবং এর পানি ও চারণভূমি বের করেছেন।

“وَالْجِبَالَ أَرْسَاهَا” — অর্থাৎ, তিনি পাহাড়গুলোকে পৃথিবীর উপর দৃঢ়ভাবে স্থাপন করেছেন, যাতে এটি স্থির থাকে এবং দুলতে না পারে।

“مَتَاعًا لَّكُمْ وَلِأَنْعَامِكُمْ” — অর্থাৎ, তিনি পৃথিবী থেকে এর পানি ও চারণভূমি বের করেছেন এবং পাহাড়গুলোকে স্থাপন করেছেন, তোমাদের ও তোমাদের চতুষ্পদ জন্তুদের (গবাদি পশুদের) উপকারের জন্য।

 

[المصدر : أيسر التفاسير للجزائري - ج ٥ - ص ٥١٢]

তথ্যসূত্রঃ https://shamela.ws/book/20808/4893


[১২] শাইখ মুহাম্মাদ আল-আমীন আল-হারারী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত্যু ১৪৪১ হিজরী]

তিনি তাঁর হাদাইকুর রূহি ওয়ার রাইহান ফি রাওয়াবি উলূমিল ক্বুরআন কিতাবের ১৪তম খণ্ডে, আল্লাহ তায়ালার এই বাণীর ব্যাখ্যায় বলেন:

{وَهُوَ الَّذِي مَدَّ الْأَرْضَ}

“এবং তিনিই পৃথিবীকে বিস্তৃত করেছেন।”

أي: بسطها طولًا وعرضًا، ووسعها؛ أي: جعلها متسعة ممتدة في الطول والعرض؛ لتثبت عليها الأقدام، ويتقلب عليها الحيوان، وينتفع الناس بخيراتها زرعها وضرعها، وبما في باطنها من معادن جامدة وسائلة، ويسيرون في أكنافها يبتغون رزق ربهم منها.

অর্থাৎ, তিনি পৃথিবীকে দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে প্রশস্ত ও বিস্তৃত করেছেন, যাতে মানুষ এর উপর দাঁড়াতে পারে, প্রাণীরা এতে চলাফেরা করতে পারে এবং মানুষ এর ফসল, দুধ ও ভূমির অভ্যন্তরে থাকা কঠিন ও তরল খনিজ সম্পদ থেকে উপকৃত হতে পারে। আর তারা এর বিভিন্ন প্রান্তে ভ্রমণ করে তাদের রবের দেওয়া রিজিক অন্বেষণ করতে পারে।

 

والمعنى: أنشأها ممدودة بسيطة، لا أنها كانت مجموعة في مكان فبسطها، وهذا يدل على كونها مسطحة كالأكف.

এর অর্থ হলো, তিনি একে প্রসারিত ও সমতলভাবে সৃষ্টি করেছেন। অর্থাৎ, এটি কোনো এক স্থানে গুটিয়ে থাকার পর বিছানো হয়নি, বরং প্রসারিত ও সমতলরূপেই সৃষ্টি করা হয়েছে। এটি পৃথিবীকে হাতের তালুর মতো সমতল হওয়ার দিকে ইঙ্গিত করে।

 

তিনি পরবর্তী পৃষ্ঠায় বলেন:

এরপরেও, আল্লাহ তায়ালা নিজেই বলেছেন যে, “তিনি বিস্তৃত করেছেন”, “তাকে সমতল করেছেন” এবং “বিছিয়ে দিয়েছেন”। এই সমস্ত শব্দই প্রমাণ করে যে, পৃথিবী সমতল। আর আল্লাহ তায়ালার বক্তব্য জ্যোতির্বিদদের কথার চেয়ে অধিক সত্য ও স্পষ্ট প্রমাণসম্মত।

 

[المصدر : تفسير حدائق الروح والريحان في روابي علوم القرآن - ج ١٤ - ص ١٦٧]



[১৩] শায়খ রাবী বিন হাদী ‎আল-মাদখালী
(রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত্যু ১৪৪৭ হিজরী]

শায়খ রাবী বিন হাদী ‎আল-মাদখালী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,

 

وإذا رجع القاريء إلى كتب فحول المفسرين لا يجد فيها أن الأرض كروية فهل يحط هذا من منازلهم ويجعلهم بدواً وبدائيين ؟ كلا ثم كلا، بل لا يساوي علماء الفلك من المسلمين كبير شيء إلى جانبهم ، فضلا عن علمائه من غير المسلمين .

 

যদি পাঠক প্রখ্যাত মুফাসসিরদের কিতাবগুলো খুঁজে দেখেন, সেখানে তিনি পৃথিবী গোলাকার—এমন কথা পাবেন না। তাহলে কি এটি তাদের মর্যাদাকে খাটো করে এবং তাদেরকে পিছিয়ে পড়া ও আদিম হিসেবে গণ্য করে? কখনই না, কখনই না। বরং মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা তাদের (মুফাসসিরগণের) তুলনায় তুচ্ছ, আর অমুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কথা তো বলাই বাহুল্য।

 

📚 كشف موقف الغزالي من السنة وأهلها ونقد بعض آرائه [63]

 


[১৪] শায়খ মুস্তাফা আল বুগা (হাফিযাহুল্লাহ) [জন্ম
~ ১৩৫৭ হিজরী]

তিনি সহীহ বুখারীর টীকায় বলেন ৪র্থ খন্ডের ১০৬ নং পৃষ্ঠায় বলেন,

(دحاها) بسطها بحيث تكون صالحة للسكنى والعيش عليها.

"{দাহা'হা} - অর্থাৎ তিনি (আল্লাহ) পৃথিবীকে এমনভাবে সমতলে বিছিয়েছেন যাতে তা বসবাস ও জীবনযাপনের জন্য উপযোগী হয়।"

صحيح البخاري (4/ 106)

 

তিনি সহীহ বুখারীর টীকায় বলেন ৬ষ্ঠ খন্ডের ১২৮ নং পৃষ্ঠায় বলেন,

(دحاها) بسطها ومدها وجعلها صالحة للسكنى والعيش عليها والتقلب في أقطارها.

"{দাহা'হা} - অর্থাৎ "তিনি (আল্লাহ) পৃথিবীকে সমতলে বিছিয়েছেন, প্রসারিত করেছেন এবং একে বসবাস, জীবনযাপন ও এর বিভিন্ন প্রান্তে চলাচলের জন্য উপযোগী করে সৃষ্টি করেছেন।"

صحيح البخاري (6/ 128)